বাংলা ভাষার রূপ, বাংলা ভাষা ও লিপি

বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ।

 ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাকে দুই ভাগে¾ কেন্তুম ও শতম

বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের শতম শাখার ভাষা ।

ভাষার প্রাকৃত রূপ থেকে বাংলার সৃষ্টি।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ  বলেছেন-গৌড়ী প্রাকৃতের পরবর্তী স্তর গৌড় অপভ্রংশ থেকে বাংলা  ভাষার উৎপত্তি।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বাংলা ভাষার জন্ম সপ্তম শতকে ।

ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলা ভাষার উদ্ভব দশম শতকে  মাগধী প্রাকৃতের পরবর্তী স্তর মাগধী অপভ্রংশ থেকে থেকে ।

বাংলা লিপি ব্রাহ্মী লিপির কুটিল রূপ থেকে এসেছে ।

সম্রাট অশোক তার অধিকাংশ কর্মব্রাক্ষ্মী লিপিতে লেখান ।

আমাদের উপমহাদেশে আর্য ভাষার যে প্রাচীনতম বর্ণমালার সন্ধান পাওয়া যায় তা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অশোকের অনুশাসনের সময়।

ব্রাহ্মী লিপির কয়টি রূপ দেখা যায়ঃ  তিনটি। সারদা (কাশ্মির ও পাঞ্জাবের প্রচলিত রূপ), নাগর (রাজস্থান ও মালব: গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে প্রচলিত রূপ), কুটিল (ভারতের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত রূপ।

বাংলা লিপির সুসংগঠন সেন রাজাদের সময় আমলে হয়।

ইংরেজ আমলে, পঞ্চানন কর্মকার  বাংলা লিপিকে ছাপাখানায় মুদ্রণযোগ্য করে তৈরি করেন ।

বাঙালির জাতি-গঠন শংকর জাতি রূপ ।

ঋক বেদ, মহাভারত, মৎস্যপুরাণ প্রাচীন গ্রন্থে বঙ্গ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

সম্রাট আকবরের সুবা-বাঙলা সম্পর্কে আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়।

আইন-ই-আকবরি গ্রন্থের রচয়িতা আবুল ফজল ।

বাংলার জননীঃ  সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের মতে বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা (কন্যা)। এ যুক্তি গৃহীত হয়নি। বাংলার জননী প্রাকৃত ভাষা।

বাংলার ভগিনী আসামিয়া

বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়  বলেছেনঃ

ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মনে করেন, মাগধী প্রাকৃত (২০০¾৭০০ খ্রীঃ) হতে মাগধী অপভ্রংশের (৭০০-১১০০ খ্রীঃ) ভিতর দিয়ে প্রাচীন বাংলা উদ্ভূত হয়। কিন্তু ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ মনে করেন, গৌড়ী প্রাকৃত (২০০-৪৫০ খ্রীঃ) হতে গৌড় অপভ্রংশের (৪৫০-৬৫০ খ্রীঃ) ভিতর দিয়ে প্রাচীন বাংলার (৬৫০ খ্রীঃ) উদ্ভব।

প্রাচীন বাংলার প্রধান নিদর্শন পাওয়া যায় বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’ (চর্যাপদ) পুস্তকে

সংস্কৃত ভাষা অপরিবর্তিত সাহিত্যিক ভাষা।

বাংলা ভাষা বিকাশের যুগে শৌরসেনা প্রাকৃত প্রাকৃতের প্রভাব বিদ্যমান ছিল।

বাংলা ভাষা গঠনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ভাষার প্রভাব লক্ষণীয়-

অনার্য অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোট-চীনীয় ভাষা গোষ্ঠীর বিশেষ করে অস্ট্রিক ভাষা গোষ্ঠীজাত কোল (মুন্ডা) ভাষার এবং অল্প সংখ্যক বৈদেশিক ভাষার প্রভাব লক্ষণীয়। অনার্য কুল (মুন্ডা) শাখাভুক্ত মুন্ডারী, সাঁওতালী, কুরকী, জুয়াঙ প্রভৃতি ভাষা সমূহের প্রভাব অতি গভীর। প্রাকৃত ভাষা হতে বাংলা যা পেয়েছে তাই বাংলার ভিত্তি। সংস্কৃত হতে বাংলা অসংখ্য শব্দ গ্রহণ করেছে।

ব্রজবুলি  ভাষাকে কৃত্রিম ভাষা বলা হয়

ভাষার বিচ্যুত বা বিকৃত ভাবকে অপভ্রংশ বলে।

বর্তমানে পৃথিবীর ভাষাসমূহের মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায় বাংলা ভাষার স্থান চতুর্থ।

দ্বিতীয় পাতা

বাংলা ভাষার প্রসার ক্ষেত্রগুলো হলো-

বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামের কাছাড় ও গোয়ালপাড়া জেলা, বিহার ও ছোটনাগপুরের সাওতাল পরগনা, মানভূম, সিংহভুম ও পূর্ব পূর্ণিয়ায় বাংলা ভাষা প্রচলিত।

দাপ্তরিক ভাষা বা Official language হিসেবে বিশ্বে বাংলার স্থান দশম

উপভাষা বা Dialect-

প্রত্যেক ভাষাতেই মৌখিক একাধিক রূপ আছে। বাংলা ভাষাতেও থানা বা উপজেলা ভেদে মৌখিক ভাষার রূপান্তর ঘটেছে। ভাষার এরূপকে অবশ্য উপভাষা বা Dialect বলে।

লৈখিক ভাষা দুই প্রকার - সাধু ও চলিত।

বাংলার মানুষের মুখের ভাষার  পাঁচটি প্রধান উপভাষা-(রাড়ি, বঙ্গালি, বরেন্দ্রী, কামরূপী ও ঝাড়খন্ডী)।

চলিতভাষা-

বাংলার মানুষের মুখের ভাষার পাঁচটি প্রধান উপভাষা-রূঢ়ি, বঙ্গালি, বরেন্দ্রী, কামরূপী ও ঝাড়খন্ডী। এগুলোর মধ্যে রাঢ়ী কলকাতা ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলের হুগলি, নদীয়া, উত্তর চবিবশ পরগাণার শিক্ষিত ও উচ্চ শ্রেণীর মানুষের মুখের ভাষা; আর এই ভাষার উপর ভিত্তি করে যে বাংলা ভাষারীতি (Standard colloquial Bengoli= SCB)  গড়ে উঠেছে তাকে বলা হয় চলিত ভাষা বা চলিত গদ্যরীতি।

যাদের হাতে বাংলা সাধু গদ্যের প্রাথমিক রূপটি বিশেষভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁদের মধ্যে  বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম-

মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। এর পর রামমোহন রায় সাধু গদ্যের আরো যুক্তিনির্ভর কাঠামো নির্মাণ করেন।

সর্ব প্রথম ‘সাধুভাষা’ কথাটি  ব্যবহার করেন-

রামমোহন রায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সাধুভাষা কথাটি তাঁর ‘বেদান্ত গ্রন্থে’ ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠকুর ও বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে সাধুভাষা বিকাশিত হয়ে সৃজনশীল ও মননধর্মী সাহিত্যের মাধ্যমে হয়ে ওঠে।

 যারা প্রথম চলিত গদ্য ব্যবহার করছেন-

বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের পর শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাসের বর্ণনায় সাধু ভাষা ব্যবহার করলেও পাত্র-পাত্রির সংলাপে তিনি চলিত গদ্য ব্যবহার করেছেন।

যেই  গ্রন্থটিকে মৌখিক গদ্য সাহিত্যের প্রথম প্রবেশাধিকার বলে ধরে নেয়া হয় তা হল-

উহলিয়াম কেরীর, ‘কথোপকথোন’ (১৮০১) গ্রন্থের বিভিন্ন শ্রেণীর সংলাপে ব্যবহৃত গদ্য যদিও আদর্শ চলিত বাংলা ছিল না তবুও এখানেই মৌখিক গদ্য সাহিত্যের প্রথম প্রবেশাধিকার বলে ধরে নেয়া হয়। বিদ্যাসাগর শকুন্তলার সংলাপ অংশে কিছু চলিত গদ্য ব্যবহার করেন।

কলকাতা অঞ্চলের চলিতভাষাকে কিঞ্চিৎ সাধুভাষার মিশ্রণসহ সাহিত্যে প্রথম রূপ দেন -

প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) উপন্যাসে। বঙ্কিমচন্দ্র, প্যারীচাঁদ মিত্রের কথ্য ভাষাকে স্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন এবঙ এই ভাষাকে ‘অপরভাষা’ বলেছিলেন। এ নামে অভিহিত করেছিলেন। একটি প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকে ‘প্রচলিত ভাষা’ থেকেই পরে ‘চলিতভাষা’ কথাটির প্রচলন হয়।

পুরোপুরি চলিতভাষার ব্যবহার করেন -

কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬২) গ্রন্থে।

বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক -

প্রমথ চৌধুরী

চলিত রীতিতে তাঁর প্রথম গদ্য রচনা-

বীরবলের হালখাতা (ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে কিন্তু গ্রন্থাকারে বের হয় ১৯১৬ সালে। এটি একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ।

প্রমথ চৌধুরী  মাসিক সবুজপত্র পত্রিকাটি সম্পাদনা করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন-

সবুজপত্র (১৯১৪)। এটি একটি সাহিত্য পত্রিকা। ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরী ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা প্রকাশ করে চলিত গদ্যের পক্ষে ব্যাপক সাহিত্যিক আন্দোলন শুরু করেন। তখন রবীন্দ্রনাথ ও তাতে উৎসাহিত হয়ে পুরোপুরি চলিত গদ্যে লেখা আরম্ভ করেন। চলিত ভাষায় লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস ‘ঘরে-বাইরে’ (১৯১৬)। উপন্যাসটি ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে। এভাবে সাহিত্যে ক্রমে চলিত গদ্য একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

সাধু ভাষায় কোন ভাষায় তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত শব্দ বেশি থাকে।

সাধু ও চলিত ভাষার গঠনগত পার্থক্য দেখা দেয়ার ক্ষেত্রসমূহ-

 (১)  সর্বনামপদে-তাহার > তার; ইহারা,> এরা

(২) ক্রিয়াপদে- করিতেছি> করছি; যাইবো> যাবো।

(৩) অনুসর্গে- অপেক্ষা > চেয়ে; হইতে > হতে।

(৪) তৎসম শব্দে- সমভিব্যাহারে > সঙ্গে; যৎপরনাস্তি > খুব।

(৫) বিশেষণে- সাতিশয় > অত্যন্ত; ঈদৃশ> এ রকম।

(৬) সমাসবদ্ধতায়-নীলোৎপলদলতুল্য > নীল পদ্মের পাঁপড়ির মতো।

ভাষার মূল উপাদন ধ্বনি।

Subject

Bangla