জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এ বছর প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছার পর একে একে প্রকাশ পেতে থাকে ভুলত্রুটিগুলো। নতুন শিক্ষাক্রমের ভীতি ও সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে এমনিতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু ভুলত্রুটিগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর তা আরও বেড়ে যায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে অসংগতিগুলো চিহ্নিত করার আহ্বান জানায়। বোর্ডের সম্পাদনা বিভাগের উদ্যোগে সম্পাদনা সহকারীদের দিয়ে মুদ্রণপ্রমাদগুলো দূর করার চেষ্টা চলছে।
বিখ্যাত দুই কবি বাদ, ভারতীয় লেখকদের আধিক্য: নবম ও দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য বইয়ে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই বিখ্যাত কবি আবদুল হাকিম ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর দুটি কবিতা বাদ দেওয়ায় তীব্র সমালোচনা হয়েছে। গত ১৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় ওই দুটি কবিতা পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
সংসদীয় কমিটির ওই সভায় পাঠ্যবইয়ে ভারতীয় কবি-সাহিত্যিকদের কবিতার আধিক্য থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা প্রথম পত্রে ১৮ থেকে ২০ জন ভারতীয় কবি-সাহিত্যিকের প্রবন্ধ বা কবিতা ছাপা হয়েছে। তবে এঁদের কয়েকজন আবার দুই বাংলার লেখক হিসেবে এতটাই পরিচিত যে, তাঁদের বাঙালি বা ভারতীয় হিসেবে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম।
এ প্রসঙ্গে কমিটির ৩৪তম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে (১৮.১) বলা হয়, ‘বাংলাদেশের কবির কবিতা ভারতের পাঠ্যসূচিতে কখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’
স্পর্শকাতর ভুল: নবম-দশম শ্রেণীর ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা পাঠ্যবইয়ে একটি স্পর্শকাতর ভুল নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি। বইটির ৮২ পৃষ্ঠায় হারাম বিষয় ও দ্রব্যের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দেবদেবীর বা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গকৃত পশুর গোশত খাওয়া’। প্রকৃতপক্ষে বাক্যটি হবে ‘আল্লাহ ব্যতীত দেবদেবীর বা অন্যের নামে উৎসর্গকৃত পশুর গোশত খাওয়া। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ হিমশিম খেয়েছে।
বইটির ইংরেজি ভার্সনে বিষয়টি সঠিকভাবে মুদ্রিত হয়েছে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও শিক্ষক সংগঠন এই ভুলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। বইটির সম্পাদক অধ্যাপক ম. আখতারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলন করে ভুল স্বীকার এবং দুঃখ প্রকাশ করেন। আগামী বছরের বইয়ে এই ভুল শোধরানোর উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি।
ভাষাশহীদের জেলার নাম নিয়ে বিভ্রান্তি: পাঠ্যবইয়ে ভাষাশহীদ আবদুস সালামের জন্মস্থান ভুল থাকায় ফেনী জেলায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ভাষাশহীদ আবদুস সালামের জন্মস্থান হিসেবে নোয়াখালী জেলার কথা বলা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর বাড়ি ওই জেলাতেই ছিল। কিন্তু এখন তাঁর বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায়। বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংশোধনী দিতে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতিবাচক কিছু বিষয়: নতুন পাঠ্যসূচিতে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাধারণ গণিত বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হয়েছে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এখনকার গণিত চর্চা করে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারবে বলে মনে করছেন গণিতবিশেষজ্ঞরা। যদিও নবম-দশম শ্রেণীর সাধারণ গণিতে কমপক্ষে ৭৬টি এবং উচ্চতর গণিতে কমপক্ষে ৮১টি ভুল রয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সব বইয়ে ভুলত্রুটি থাকলেও নবম-দশম শ্রেণীর মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য এবং পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে সহজ এবং সমকালীন ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে। সাহিত্যের বাক্য বিন্যাসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আধুনিকতা লক্ষ করছেন সাহিত্যিকেরা।
মাধ্যমিকের ছয়টি নতুন বিষয় এ বছর থেকে চালু হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক শিক্ষা স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং।
শারীরিক শিক্ষার বিষয়টি প্রশংসিত হলেও কিছু আপত্তি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসার (প্রকৃতপক্ষে মাধ্যমিক বিদ্যালয়) শিক্ষক আজমিরা খাতুন বলেন, শারীরিক শিক্ষা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু শরীরের বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
মুদ্রণপ্রমাদ কমবে, থাকবে নানা অসংগতি: এনসিটিবি সূত্রমতে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সম্পাদনা সহকারীদের দিয়ে কেবল বইয়ের মুদ্রণপ্রমাদ ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুরোনো তথ্য হালনাগাদ, জটিল বাক্য সহজ করা, বিভ্রান্তিকর তথ্য বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সব অসংগতি এবার দূর হচ্ছে না।
এনসিটিবির প্রতিটি বই লেখা ও সম্পাদনার সঙ্গে ছয় থেকে ১২ জন শিক্ষক বা লেখক জড়িত থাকেন। এ ছাড়া এনসিটিবির রয়েছে সম্পাদনা বিভাগ। বছরের শুরুতে বই প্রকাশ হওয়ার পর একেকটি বই সম্পাদনার জন্য সাত থেকে আট মাস সময় পেয়েছে এনসিটিবি। তার পরও ত্রুটিমুক্ত হচ্ছে না বইগুলো।
একসঙ্গে সব বই সংশোধন করতে গিয়ে গোলমাল: ২০০৮ সালের ৩০ জুন প্রথম আলোয় ‘ভুলে ভরা পাঠ্যবই’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপা হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ নিজ হাতে এই প্রতিবেদনে নোট দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভুলত্রুটিগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেন। এর পর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিবছর কিছু কিছু পাঠ্যবই সংশোধন করা হয় এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রায় সব বই সংশোধন হয়।
কিন্তু ২০১২ সালে এসে এনসিটিবি নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে মাধ্যমিকের ৭০টি বই নতুন পাঠ্যক্রমে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু ও পাঠ্যক্রমে বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজন হওয়ায় প্রায় দেড় যুগ পর শিক্ষাক্রমে এই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু একসঙ্গে সব বই বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তড়িঘড়ি হয়েছে প্রচুর।
শিক্ষক আজমিরা খাতুনের মতে, বইগুলো পরীক্ষামূলক সংস্করণ হওয়ায় এনসিটিবি কিছুটা দায়মুক্তি পেতে পারে। আগামী বছর এ রকম ভুলত্রুটি ও অসংগতি থাকলে বোর্ড কঠোর সমালোচনার মুখে পড়বে।